অভ্যুত্থান নয় আইএমএফ নির্ধারণ করছে অর্থনীতির নীতি পদক্ষেপ

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ ছয় মাসের পুরো সময়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল দুই অংকের ঘরে।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। এ ছয় মাসের পুরো সময়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল দুই অংকের ঘরে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশনে নেয়া সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ব্যবসা, বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তা কোনোভাবেই কাজে আসেনি। সংস্থাটির প্রেসক্রিপশনে রাজস্ব বাড়াতে জরুরি বেশকিছু খাতে আরোপ করা হয়েছে ভ্যাট। তাতে রাজস্ব না বাড়লেও মূল্যস্ফীতির নাভিশ্বাস আরো চেপে বসেছে। সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতিতে বিগত ছয় মাসে গণমুখী কোনো সংস্কার ঘটেনি। বিগত সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নীতিপদক্ষেপগুলো আইএমএফের প্রেসক্রিপশননির্ভর রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশনে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো বা এতে কাঠামোগত পরিবর্তন আনার প্রয়াস কখনো অতীতে সফল হতে দেখা যায়নি। বরং সরকার আইএমএফের কাছ থেকে আরো বাড়তি তহবিল চাওয়ায় সামনে নতুন করে আরো কিছু শর্ত বাস্তবায়নের চাপ তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের অর্থনীতির মূল দর্শনকে এখনো এ প্রেসক্রিপশনের বাইরে আনা যায়নি। যদিও গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের অর্থনীতি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনকল্যাণমূলক হয়ে উঠবে বলে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল।

গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় এখন মূল্যস্ফীতির হার বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, জানুয়ারিতে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘদিন ধরেই দুই অংকের ঘরে। জানুয়ারিতে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ১০ দশমিক ৭২ শতাংশ। আগের মাস অর্থাৎ ডিসেম্বরে এ হার ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ। বাজারে শীতের সবজির সরবরাহ বেশি থাকায় এ খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমলেও তা এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আসন্ন রমজানে তা কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটি নিয়েও রয়েছে সংশয়। ভরা আমন মৌসুমে চালের দাম বেড়েছে দফায় দফায়। বন্যার প্রভাবে আমনের ফলন কম হওয়ায় এমনটা হয়েছে বলছেন সংশ্লিষ্টরা। সার ও সেচের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় বোরোর উৎপাদন নিয়েও আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত ছয় মাসে সরকার আর্থিক খাতের সুষ্ঠু কোনো উন্নতি করতে পারেনি। এ সময় গৃহীত নীতিপদক্ষেপগুলো খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। সরকার জনগণের চেয়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ছয় মাসে অর্থনীতিতে সামগ্রিক কোনো উন্নতি হয়নি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি থেকে আমরা বের হতে পারিনি। প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা। নতুন বিনিয়োগ নেই। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ব্যাংক খাত, বাজার ব্যবস্থাপনায় আমরা শক্ত কোনো পদক্ষেপ দেখিনি। বরং আইএমএফ ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ পেতে তাদের পরামর্শগুলোকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে। নতুন করে ভ্যাট আরোপ করা হচ্ছে। এখানে উচ্চমূল্যের বাজারে জনগণের কষ্টকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। তবে যেসব খাত শক্তিশালী বা যারা আন্দোলনের হুমকি দিতে পারছে, তাদেরকে কিছুটা ছাড় দেয়া হয়েছে। তবে রাজস্ব খাতের দুর্বলতা দূর না করে শুধু করহার বাড়িয়ে বা ভ্যাট আরোপ করে রাজস্ব বাড়ানো যায় না। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা তা-ই বলে।’

বন্যায় আমনের উৎপাদন কম হওয়ায় সরকারি মজুদ প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি। বোরোর ফলন নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। কঠিন সময়ে টিসিবি ও খাদ্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ বাড়েনি। কিছু ক্ষেত্রে কার্ড জটিলতায় ট্রাকসেল কমেছে, জোরদার করা হয়নি ওএমএসের কার্যক্রমও।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষি উৎপাদন মৌসুমে দাম কিছুটা কমলেও মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী দুই-তিন মাসে তা কমার সম্ভাবনাও কম। এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার নীতিসুদহার বাড়ালেও কৃষি উৎপাদন না বাড়ায় এর প্রভাব বাজারে পড়েনি। গত বছর বন্যায় আমন ও আউশের ফলন ভালো হয়নি। ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিয়েছে। আসন্ন বোরো মৌসুমেও উপকরণ সরবরাহ ভালো না। সার সংকট রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকলে সেচ কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আবার কৃষিপণ্যের বা সবজির দাম উৎপাদন খরচের নিচে নেমে গেলেও সরকার ছিল নির্লিপ্ত। ওএমএসের কার্যক্রম অর্ধেকে নেমেছে। সরকারের চালের মজুদও কম। তাই চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপের সুযোগও কমে এসেছে।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ছয় মাসে সরকারের আর্থিক নীতিগুলোর কোনোটাই সফলতার মুখ দেখেনি। স্থবির প্রবৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ নেই। কৃষি ও অকৃষি খাতে উৎপাদন এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠছে। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদেশী অর্থায়নের গতিও এখন কমে এসেছে। রিজার্ভ পতন সাময়িকভাবে থামানো গেছে। সরকার সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে ওএমএসের কার্যক্রম বাড়ায়নি। বরং আইএমএফের পরামর্শে ভ্যাট আরোপ করায় মানুষের কষ্ট বেড়েছে। এর মধ্যেই আইএমএফের শর্তের আলোকে রাজস্ব বাড়াতে বিভিন্ন পণ্যে ভ্যাট আরোপ করায় জনঅসন্তোষ বেড়েছে। যদিও অর্থনীতির নীতিপদক্ষেপগুলোয় জনঅসন্তোষের চেয়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্ধ অনুসরণই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি।

কয়েক বছর ধরেই দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বেশ মন্থর। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে গত ছয় মাসে তা আরো মন্থর হয়ে এসেছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই থেকে নভেম্বর) দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগে গত অর্থবছরের একই সময়ে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুন শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। নভেম্বর শেষে ঋণের এ স্থিতি বেড়ে ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সে হিসাবে পাঁচ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ স্থিতি বেড়েছে মাত্র ২৩ হাজার ৯৫ কোটি টাকা। আর ঋণ প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১ দশমিক ৪১ শতাংশ।

মূলধন প্রবাহ কমে আসায় বেসরকারি খাত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। সরকারি বিভিন্ন নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলোও নানান জটিলতায় ঝুলে গেছে। তাই চাকরিপ্রত্যাশী বা চাকরির পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়মিত রাস্তায় আন্দোলন করতে দেখা যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গত ১০ বছর ধরেই দেশে বিনিয়োগ খরা চলছিল। গত ছয় মাসে পরিবেশের কোনো উন্নতি হয়নি। বরং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। ঘুস-দুর্নীতি কমেনি। অনিশ্চয়তা আরো বাড়ছে। নির্বাচিত সরকার না এলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। আর বিনিয়োগ না থাকায় এখন তো চাকরিই নেই।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস শেষে রাজস্ব আহরণে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৫৮ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার, যা গত অর্থবছর একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমেছে, যা ৬ শতাংশের সমান।

বিপুল রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারকে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারের নিট ব্যাংক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। একই সঙ্গে সরকারের বিদেশী অর্থায়নও আগের চেয়ে কমে এসেছে।

তবে গত ছয় মাসে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য এখন ইতিবাচক ধারায় রয়েছে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর শেষে চলতি হিসাবের ভারসাম্য দাঁড়িয়েছে ৩৩ মিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময় শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ মিলিয়ন ডলার। গত ডিসেম্বর শেষে দেশের আর্থিক হিসাবের উদ্বৃত্ত ছিল ১ হাজার ৩৭৯ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৬০৪ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস শেষে বৈদেশিক লেনদেনের বিওপির ঘাটতি কমে নেমে এসেছে ৩৮৪ মিলিয়ন ডলারে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৫১ মিলিয়ন ডলার।

বিওপিকে ঘাটতি থেকে উদ্বৃত্তের ধারায় ফিরিয়ে আনতে না পারলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ বিওপি ঘাটতিতে থাকলে তা সার্বিকভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে চাপে ফেলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি শেষে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (বিপিএম৬) অনুসারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার।

হুন্ডির চাহিদা কমায় ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। ছাত্র আন্দোলনের পর প্রবাসী বাংলাদেশীরা সেপ্টেম্বরে দেশে পাঠিয়েছেন মোট ২৪০ কোটি বা ২ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ২৮ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বরে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৬৪ কোটি ডলারে, যা দেশের ইতিহাসে এক মাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্সের রেকর্ড। দেশের ইতিহাসে কোনো একক মাসে এটি সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়।

আরও